latest

প্রসঙ্গ : ধর্ষণ (শেষ খণ্ড)

শিউলি আহসান নদী

যখনই সম্ভাবনা একটু জায়গা দখল করে- হতাশার দীর্ঘ হাত তখনই আমাদের বন্দি করতে অগ্রসর হয়।ভয়াল স্বৈর ও দানবীয় শক্তির মারন ছোবলে তখনই ক্ষত-বিক্ষত হই আমরা ।আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে, তারপর পিঠের সঙ্গে পেট ঠেকে একাকার হয়।আমাদের মানুষেরা জ্বলে জ্বলে জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয় ।সৎ,নিষ্ঠাবান ও বিবেকবান মানুষেরা মৃয়মান, কোনঠাসা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।সাধারন ও পোষাকী মানুষেরা সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাকে শ্রেয় মনে করে ।আর এভাবেই আমাদের আজন্ম লালিত স্বাধীনতার স্পৃহা ও স্পর্ধা লুণ্ঠিত হতে থাকে ।আমাদের আশা আকাঙ্খা ধূলিস্যাৎ হতে থাকে ।আমরা কিছু করি না- কেবল দেখি।একটি স্বাধীনচেতা জাতিকে ধর্মান্ধ মাতাল বানানোর পাঁয়তারা চলে- আমরা চুপ ।জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয় ধর্মনিরপেক্ষতা,জাতীয়তা,গনতন্ত্র,বাকস্বাধীনতা,চলাফেরার স্বাধীনতা- আমাদের সে হুঁশ নেই ।একটা দাঁতাল ষড়যন্ত্র গোটা জাতিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে ।আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে--ফুল, পাখি,প্রজাপতি হয়ে ওড়ার আগেই দানব এসে তাদের ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলছে- আমরা চুপ ।আমাদের মেয়েরা যেখানে সেখানে অবাধে ধর্ষিত হচ্ছে ।আমাদের কিছু করার নেই।আমরা কেবল দেখি,শুনি কেবল মানুষের অসহায় আর্তনাদের আনন্দ উপভোগ করি।আমাদের বিবেক এগুলো দেখে শুনে অনুভূতিহীন হয়ে গেছে । সন্দেহ নেই যে, আমাদের জীবনের পথ সুদীর্ঘ এবং দূর্গম।কুসুমাস্তীর্ন নয় মোটেই ।বহু স্খলন পতন -এর ভিতর দিয়েই আমাদের কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয় ।তবু দেশ,মানুষ ও দেশের কল্যাণ সবার উপরে স্থান পাবে এটাই কাম্য । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেয়েদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করতে দেখি,বাজে স্টেটাস দেখি।দেখি,মেয়েদের পোশাক নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইয়ে দেয় কেউ কেউ ।এতে আবার অনেকেই সুখ পায় ।ফেজবুকে অন্যের মেয়ের পোশাক নিয়ে বিতর্ক না করে যদি নিজ সন্তানের নৈতিক অবনতির কারণ খুঁজে বের করতেন প্রতিটি বাবা-মা,তাহলে তারা দেখতেন তারা নিজেরাই তাদের সন্তানের মাথা নষ্ট করছেন। কারণে অকারণে দামী মোবাইল, ট্যাব,ল্যাপটপ তারা সন্তানের হাতে তুলে দেন ছোট বেলাতেই।এসবের মাধ্যমে তাদের সন্তানেরা কোন জগতে চলে যাচ্ছে, কি দেখছে, কি করছে বাবা মা তার খোঁজ রাখেন না ।কাজেই রাস্তাঘাটে কোন মেয়ে দেখে কারো মাথা নষ্ট হয় না, যা নষ্ট হবার তা তাদের মোবাইল ও ইন্টারনেট এর বদৌলতেই হয়ে যায় ।এছাড়া খারাপ বন্ধু বান্ধব তো আছেই । আমাদের দেশের মেয়েরা খারাপ পোশাক পরিধান করেন না।শহরের রাস্তায় বের হলেই মিনি স্কার্ট পরিহিত কোন মেয়ে দেখা যায় না ।গ্রামে তো প্রশ্নই ওঠে না। বেশির ভাগ মুসলমান নারী পর্দা করেন ।বাকিরা শাড়ি ও সালোয়ার কামিজ পরেন।স্কুলে পড়ুয়া মেয়েরা কেউ কেউ জিন্স- টপস- ওড়না পরিধান করে।এমনকি উচ্চবিত্ত শ্রেণির মেয়েরাও পর্দা করেন - দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ।আর ব্যাতিক্রম নিশ্চয়ই কোন উদাহরণ নয়।যদিও ধর্ষণের কারণ কোন ভাবেই পোশাক নয়-তবু একথা সত্য যে ধর্ষণের জন্য মেয়েদের পোশাককে দায়ী করা হয় ।ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়- নারীর চলাফেরাকে ,কথাবলাকে , নারীর পেশাকে ,ঘরে ফেরার সময়কে-এমনি হাজার কিছুকে।যেন ধর্ষণের জন্য নারীই মুখিয়ে থাকে ।তাই ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতাই দায়ী, ধর্ষক নয়।তবে যে কন্যা নিজ পিতা কতৃক ধর্ষিত হয় নিজ বাড়িতে..!!?? সেখানে কে দায়ী? আর এই ঘটনা কোন ব্যতিক্রম ঘটনা নয়, কেননা প্রায়ই ঘটছে এমন ঘটনা ।দু'/তিন বছরের শিশু থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধা,রাস্তার পাগলীটি পর্যন্ত যেখানে ধর্ষণের শিকার হয় সেখানে কাকে দায়ী করবে এই সভ্য সমাজ ।যদি পিতার কাছে তার নিজের কন্যা সুরক্ষিত না থাকে তবে বলতেই হবে মানুষের মন থেকে ধর্ম বিদায় নিয়েছে ।তাই প্রয়োজন মানুষের নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা, মানুষের মনে- লোক দেখানো নয়, সত্যিকারের ধর্মকে স্থাপন করা ।এখানে নারীকে আপাদমস্তক ঢেকে ফেলেও পুরুষের মনে ধর্মানুভূতি তৈরি করা যাবে না । আমাদের দেশের মানুষের কাছে নারীর মূল্য হলো-নারী কি পরিমাণে সেবাপরায়ণ,স্নেহশীলা,সতী এবং দুঃখ কষ্টে মৌনা।অর্থাৎ নারীকে নিয়ে কি পরিমাণে সুখ ও সুবিধা ঘটবে জীবনে এবং কি পরিমাণে নারী রুপসী! কি পরিমাণে পুরুষের লালসা ও প্রবৃত্তিকে নিবদ্ধ ও তৃপ্ত রাখতে পারে ।এ সমাজের ভাবনা আল্লাহ তায়ালা নারীকে পুরুষের যৌনানন্দ দানের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন ।তাই নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক দোষের নয়।ফলে নির্বিচারে চলে ধর্ষণ ।ধর্ষিতার পরিবার বেশির ভাগ সময়ই ন্যায় বিচার পায়না।কারণ ধর্ষক টাকা খরচ করলেই তার পক্ষে আইনি লড়াইয়ে জন্য পেয়ে যায় বড় বড় উকিল-ব্যারিস্টার ।অপরদিকে ধর্ষিতার পরিবার বেশিরভাগই থাকে দরিদ্র ও অসহায় । তার উপর নানা জটিলতায় বিচার হচ্ছে না ৩০% ধর্ষণ মামলার ও।আমরা যদি একটুও নীতি- নৈতিকতার ধার না ধারী তবে সমাজের এই ব্যাধি দূর হবে কিভাবে? যতোদিন নারীকে মানুষ না ভেবে, পুরুষের সমকক্ষ না ভেবে কেবল কাম- লালসা চরিতার্থ করার সামগ্রী মনে হবে ততোদিন নারী নিরাপদ নয় ,ততোদিন পর্যন্ত নারী ধর্ষিত হতে থাকবে।যতোদিন পুরুষ নারীকে, এবং নারী নিজেকে সম্মান প্রদর্শন করবে না, দূর্বল, অসহায় ও অপদার্থ ভাববে ততোদিন ধর্ষণ বন্ধ হবে না ।আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতি নারী-পুরুষ উভয়ের মনে গড়ে তোলে অসমতার ভাবনা ।উভয়ের মনেই ধারণা দেয়-নারী পরিপূর্ণ মানুষ নয়।নারীর সমস্যা আছে ।নারীর সমস্যা আছে- শরীরে,বুদ্ধিতে, শক্তিতে, ক্ষমতায়, যোগ্যতায়,দায়িত্ব পালনে,মেধায়, মননে-মননশীলতায়।এ সমাজ,ধর্ম ও আইন এরুপ ভাবতে শিখিয়েছে, অনুমোদন দিয়েছে । এদেশের মানুষ সর্বদা অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, সংগ্রাম করেছে।রাজপথে নেমে এসেছে এদেশের সর্বস্তরের মানুষ ।তাতে অংশ নিয়েছেন,রাজনীতিবিদ , সংস্কৃতসেবী,কবি, সাহিত্যিক,বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সকল পেশাজীবী মানুষ ।সেসব আন্দোলনে বিজয় ছিলো জনতার বিজয় ।ন্যায়ের বিজয় ।এক অনন্য মানবধর্মের বিজয় ।তেমনি আর একবার বিজয় অর্জনের জন্য জেগে উঠতে হবে দেশের মানুষকে । জনতাকেই সোচ্চার হতে হবে,কঠোর হাতে দমন করতে হবে বিকৃত যৌনচর্চাকারীদেরকে।আর এই ঘৃণ্য বিকৃত যৌনচর্চার হাত থেকে বাঁচাতে হবে আমাদের শিশুদের, নারীদের ।ধর্ষণ শব্দটিকে সমাজ থেকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে ।তাহলেই শান্তি পাবে রুপা,তনু,রেখা বিউটিদের আত্মা।সারাদেশে প্রতিদিন আরও যেসব রুপা,বিউটি জন্ম নিচ্ছে তাদের তরে আমার কেবল এইটুকু প্রার্থনা-"ও মেয়ে তোমার সূর্যের আয়ু হোক " । নানা সমস্যার ভারে জর্জরিত এ দেশ তলিয়ে যাবে কি ভাসবে- সে ভাবনা হয়তো আমার নয়।এর জন্য অনেক দেশপ্রেমিক মানুষ ও যোগ্যতা সম্পন্ন নেতা-নেত্রী রয়েছেন । তবে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি চাই,-অন্তত মানুষ বাঁচুক-স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে বাঁচুক ।অবিরাম পঁচা মাংসের গন্ধ, রক্তের গন্ধ পেয়ে পেয়ে- বিবেকের নিরন্তর দংশন, অপরাধ বোধের জ্বালা এবং মনুষত্বের অপমান থেকে আমার মতো একন্তই ছা-পোষা, শান্তিকামী সরল সকল বাঙালি নারী পরিত্রাণ পাক।।